নারী হত্যাকে ফৌজদারি বিধিতে অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে আরেক ধাপ অগ্রগতি

মাসুদ করিম

গত বুধবার কানাডার বিচারমন্ত্রী শন ফ্রেজার বিলটি উপস্থাপন করেন

কানাডায় নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা এবং হত্যার ক্রমবর্ধমান ঘটনাকে আইনের আওতায় আরও কঠোরভাবে মোকাবিলা করতে ফৌজদারি বিধিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছে সরকার। বিপন্ন ভুক্তভোগীদের সুরক্ষার লক্ষ্যে এ সপ্তাহে ‘প্রোটেক্টিং ভিক্টিমস অ্যাক্ট’ নামে পরিচিত বিল সি-১৬ সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে, যা নারী হত্যাকে (ফেমিসাইড) ফৌজদারি আইনে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

গত বুধবার কানাডার বিচারমন্ত্রী শন ফ্রেজার বিলটি উপস্থাপন করেন। প্রস্তাবিত এই আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো বিভিন্ন ধরনের যৌন অপরাধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি বৃদ্ধি করা এবং বিদ্বেষপ্রসূত হত্যাকাণ্ডকে ফার্স্ট-ডিগ্রি মার্ডার হিসেবে গণ্য করা। এর মাধ্যমে নারী হত্যাকে আর বিচ্ছিন্ন বা সাধারণ অপরাধ হিসেবে নয়, বরং কাঠামোগত ও গুরুতর সহিংস অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কানাডিয়ান ফেমিসাইড অবজার্ভেটরি ফর জাস্টিস অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি (সিএফওজেএ)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও গবেষক ড. মিরনা ডসন বলেন, “কয়েক দশক ধরেই এটা স্বীকৃত যে নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা একটি পাবলিক হেলথ সংকট। আইন এ সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।”

তার মতে, নারী হত্যাকে আলাদাভাবে চিহ্নিত না করলে এর প্রকৃত মাত্রা বোঝা সম্ভব নয় এবং নীতিনির্ধারণেও ঘাটতি থেকে যায়।

এ সপ্তাহে এক সংবাদ সম্মেলনে বিচারমন্ত্রী শন ফ্রেজার বলেন, পরিবার, কমিউনিটি এবং দেশের ওপর ফেমিসাইডের মারাত্মক প্রভাবের স্বীকৃতি দিতেই সরকার আইনে কিছু মৌলিক পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে। তিনি জানান, কোনো হত্যাকাণ্ডের পেছনে যদি নির্দিষ্ট কারণ যেমন লিঙ্গভিত্তিক বিদ্বেষ, পারিবারিক সহিংসতা বা ঘৃণাজনিত উদ্দেশ্য প্রমাণিত হয়, তাহলে সেটিকে ‘গঠনমূলক ফার্স্ট-ডিগ্রি মার্ডার’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। একইভাবে, কোনো হত্যাকাণ্ড বিদ্বেষপ্রসূত হলে সেটিও ফার্স্ট-ডিগ্রি মার্ডারের আওতায় আসবে।

স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে দেশটিতে সংঘটিত প্রতি ছয়টি নরহত্যার মধ্যে একটি ঘটেছে ভুক্তভোগীর ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর হাতে। এসব ঘটনার ৮১ শতাংশ ভুক্তভোগী ছিলেন নারী। ড. মিরনা ডসন বলেন, এই সহিংসতার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে, যা গভীর উদ্বেগের বিষয়।

তিনি কোভিড-১৯ মহামারির সময়কার পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করে বলেন, “মহামারি শুরু হলে আমরা প্রায়ই বলতাম, কোভিড আসলে দ্বিতীয় একটি মহামারি নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা। ২০১৯ সাল থেকে পুরুষের হাতে নারীদের হত্যার ঘটনা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। আমার মনে হয়, আমরা যা দেখছি, তা হিমশৈলের কেবল চূড়ামাত্র।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিল সি-১৬ পাস হলে এটি শুধু শাস্তি বাড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সমাজে একটি শক্ত বার্তা দেবে নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা কোনো ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিষয় নয়, এটি একটি গুরুতর অপরাধ এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে মোকাবিলার দাবি রাখে।

তারা আরও মনে করেন, আইন পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ভুক্তভোগীদের জন্য সহায়তা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করাও জরুরি।

সব মিলিয়ে, বিল সি-১৬ কানাডায় নারী হত্যাকে ফৌজদারি আইনে স্বীকৃতি দেওয়ার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

This article was written by Masud Karim as part of the LJI

Related Articles

Back to top button