গ্রোসারি পণ্য চুরির ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃতদের বিনামূল্যে সেবা

মাসুদ করিম

গ্রোসারি স্টোরের সারিগুলোতে ছুটির দিনের সুর, সাজানো গোছানো তাকজুড়ে মৌসুমি নানা পণ্যের সম্ভার দেখতে সবই স্বাভাবিক।

গ্রোসারি স্টোরের সারিগুলোতে ছুটির দিনের সুর, সাজানো গোছানো তাকজুড়ে মৌসুমি নানা পণ্যের সম্ভার দেখতে সবই স্বাভাবিক। কিন্তু এই দৃশ্যের আড়ালে ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে এক গভীর বৈপরীত্য। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবারের ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধির চাপে কানাডার বহু পরিবার আজ ভালোভাবে খাওয়ার সংস্থান করতেই হিমশিম খাচ্ছে।

এই বাস্তবতার প্রেক্ষিতেই গ্রেটার টরন্টো এরিয়ার একটি প্যারালিগ্যাল প্রতিষ্ঠান নিয়েছে এক ব্যতিক্রমী হলিডে উদ্যোগ। মিগুয়েল সিলভারস্টেইন প্যারালিগ্যাল এলএলপি প্রথমবারের মতো এমন ব্যক্তিদের বিনামূল্যে আইনি সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে প্রথমবার গ্রোসারি পণ্য চুরির অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, প্রয়োজনের তাগিদে যারা এই কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন, মূলত তাদেরকেই সহায়তার আওতায় আনা হচ্ছে। একই সঙ্গে তারা আশা প্রকাশ করেছে, খাবারের দাম বাড়তে থাকায় ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনায় ক্ষমা বা বিকল্প ব্যবস্থার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

প্রতিষ্ঠানটির সনদপ্রাপ্ত প্যারালিগ্যাল জেরেমি জে. সিলভারস্টেইন জানান, এই উদ্যোগের ভাবনাটি প্রথম আসে তার মাথায় মিসিসোগার একটি ফুড ব্যাংকে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করার সময়। গত মার্চে প্যারালিগ্যাল হিসেবে কাজ শুরু করা সিলভারস্টেইন বলেন, “আমি দলে দলে মানুষকে ফুড ব্যাংকে আসতে দেখেছি। এমন অনেক খাদ্যপণ্য ছিল, যেগুলোর প্রাপ্যতা তাদের থাকা উচিত ছিল, কিন্তু তারা তা পাচ্ছিল না। আমরা এখানে সব ধরনের মানুষদের কথাই বলছি বিভিন্ন পেশা, বিভিন্ন সামাজিক অবস্থানের। আপনি ভাবতেও পারবেন না, কত মানুষ এখন ফুড ব্যাংকের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে।”

এই সংকটের চিত্র আরও স্পষ্ট হয়েছে ফিড অন্টারিও প্রকাশিত সাম্প্রতিক বার্ষিক ক্ষুধা প্রতিবেদনে। ডিসেম্বরে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে সংস্থাটি সতর্ক করে জানায়, অন্টারিও প্রদেশে ফুড ব্যাংকের চাহিদা তাদের সামর্থ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের পর থেকে ফুড ব্যাংক ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়েছে ৮৭ শতাংশ। শুধু ২০২৫ সালেই এক কোটির কাছাকাছি, অর্থাৎ ১০ লাখেরও বেশি মানুষ ফুড ব্যাংকের সহায়তা নিতে বাধ্য হয়েছেন।

সিলভারস্টেইন জানান, অন্টারিওতে এখন ব্রেড, ডিম কিংবা বেবি ফরমুলার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য চুরির ঘটনায় অভিযুক্ত হওয়ার সংখ্যা বাড়ছে। তবে এই উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে তাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে আদালতে দেখা একটি নির্দিষ্ট মামলা। তিনি বলেন, “একজন জ্যেষ্ঠ নাগরিকের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ আনা হয়েছিল। তিনি আক্ষরিক অর্থেই একটি টুনা মাছের ক্যান আর আধা পাউরুটি চুরি করেছিলেন। তাকে দেখে ভীষণ পরাজিত আর লজ্জিত মনে হচ্ছিল। আমি সেই মুখটা কোনোদিন ভুলব না।”

সিলভারস্টেইনের কথায়, এই পরিস্থিতি যে কারও ক্ষেত্রেই ঘটতে পারে। “এটা আমার প্রপিতামহের সঙ্গেও ঘটতে পারত,” বলেন তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ শুধু আইনি সহায়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সমাজের গভীর সংকটের দিকটিও সামনে আনছে। ছুটির মৌসুমের আলো-ঝলমলের আড়ালে যে বহু পরিবার প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করতে লড়াই করছে, এই উদ্যোগ সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

This article was written by Masud Karim as part of the LJI

Related Articles

Back to top button