প্রতারণার অভিযোগে এক কোম্পানির বিরুদ্ধে অন্টারিও সরকারের মামলা

দিদার হোসেন

কানাডার অন্টারিও প্রদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জালিয়াতিপূর্ণ প্রতিনিধিত্বের অভিযোগ এনে মামলা করেছে প্রাদেশিক সরকার।

কানাডার অন্টারিও প্রদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জালিয়াতিপূর্ণ প্রতিনিধিত্বের অভিযোগ এনে মামলা করেছে প্রাদেশিক সরকার। তবে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান গেট আ-হেড ইনকর্পোরেশন এবং এর মূল কোম্পানি কিল ডিজিটাল সল্যুশন্স অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে আদালতে নিজেদের পক্ষে জোরালো বিবৃতি দাখিল করেছে। পাশাপাশি সরকারের পদক্ষেপকে ‘সুনাম নষ্টের অপচেষ্টা’ আখ্যা দিয়ে প্রায় ৯ কোটি ৮০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে তারা।

এ বছরের শুরুতে অন্টারিও সরকার যে মামলাটি দায়ের করে, তাতে অভিযোগ করা হয় গেট আ-হেড ইনকর্পোরেশন মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং সেশনের প্রকৃত সংখ্যার তুলনায় বেশি দেখিয়েছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটি সরকারি তহবিল থেকে কয়েক লাখ ডলার অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করেছে বলে দাবি সরকারের। আরও অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর প্রান্তিক প্রতিবেদন জমা দিয়ে সরকারের কাছে প্রকৃত চিত্র গোপন করেছে।

সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, এই অনিয়ম ধরা পড়ে একটি নিরীক্ষা প্রতিবেদনের মাধ্যমে। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ওই নিরীক্ষার ফলাফল পরবর্তীতে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর জেরে অন্টারিও প্রভিন্সিয়াল পুলিশ বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে।

এই সপ্তাহে আদালতে দাখিল করা বিবৃতিতে গেট আ-হেড ও কিল ডিজিটাল সল্যুশন্স দাবি করেছে, সরকারের নিরীক্ষা প্রক্রিয়া ছিল গোপনীয়, অস্বচ্ছ এবং গুরুতরভাবে ত্রুটিপূর্ণ। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিরীক্ষা পদ্ধতিতে স্বচ্ছতা ও প্রমাণভিত্তিক যাচাইয়ের ঘাটতি ছিল, যা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্ত তৈরি করেছে।

কোম্পানির আইনজীবীরা আরও যুক্তি দেন, নিরীক্ষায় তথাকথিত ‘অসঙ্গতি’ পাওয়ার কথা বলে সরকার যখন বিষয়টি পুলিশের কাছে পাঠায়, তখন থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে এর পেছনে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উদ্দেশ্য কাজ করছে। তাদের অভিযোগ, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে সরকারের লক্ষ্য ছিল প্রতিষ্ঠানের সুনামহানি ঘটানো এবং বাজারে তাদের অবস্থান দুর্বল করা।

এই প্রেক্ষাপটে কিল ডিজিটাল সল্যুশন্স প্রায় ৯ কোটি ৮০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে। তাদের দাবি, সরকারের আটকে রাখা অর্থ, চুক্তিভিত্তিক কাজ স্থগিত হওয়া এবং কর্পোরেট মূল্য কমে যাওয়ার ফলে তারা ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

ঘটনাটি শুধু আদালতের সীমায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। সম্প্রতি অন্টারিও আইনসভার অধিবেশনে কিল ডিজিটাল সল্যুশন্সের কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। শ্রম মন্ত্রণালয়ের প্রায় ২৫০ কোটি ডলারের দক্ষতা উন্নয়ন তহবিল কর্মসূচির অন্যতম সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠান ছিল এই কোম্পানি।

এদিকে অডিটর জেনারেলের এক প্রতিবেদনে দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিতে ন্যায্যতা ও স্বচ্ছতার ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, কিছু প্রতিষ্ঠান কম র‌্যাংকিং পাওয়ার পরও তহবিলের জন্য যোগ্য বিবেচিত হয়েছে। এতে নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং সরকারি তহবিল বণ্টনের মানদণ্ড কতটা কার্যকর ছিল, তা নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মামলার ফলাফল অন্টারিওর সরকারি তহবিল ব্যবস্থাপনা এবং বেসরকারি অংশীদারদের সঙ্গে সরকারের সম্পর্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। যদি সরকারের অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে তা সরকারি অনুদান ব্যবস্থায় আরও কঠোর নজরদারির পথ খুলে দিতে পারে। অন্যদিকে, যদি কোম্পানির দাবি সঠিক প্রমাণিত হয়, তবে সরকারের নিরীক্ষা ও তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠতে পারে।

এ মুহূর্তে উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড়। আদালতের পরবর্তী শুনানির দিকে নজর রাখছেন সংশ্লিষ্ট মহল। তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয় তবে ইতোমধ্যেই ঘটনাটি অন্টারিওর প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কর্পোরেট নীতিশাস্ত্র নিয়ে বিস্তৃত আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

Related Articles

Back to top button