নিরাপদ মাদক গ্রহণ কেন্দ্র বন্ধের পথে, বাড়তে পারে মৃত্যু—সতর্কতা স্বাস্থ্যকর্মীদের

মাসুদ করিম

প্রাদেশিক স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে টরন্টোর দুটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে নির্দিষ্ট সময়সীমার পর তাদের জন্য সরকারি অর্থায়ন আর থাকবে না

অন্টারিও প্রাদেশিক সরকারের সাম্প্রতিক এক নীতিগত সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, স্বাস্থ্যকর্মী এবং ক্ষতি-নিয়ন্ত্রণ কর্মীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে নিরাপদ মাদক গ্রহণ কেন্দ্রগুলোর অর্থায়ন বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এই কেন্দ্রগুলোর ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মুখে।

প্রাদেশিক স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে টরন্টোর দুটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে নির্দিষ্ট সময়সীমার পর তাদের জন্য সরকারি অর্থায়ন আর থাকবে না। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই দুটি কেন্দ্রই বর্তমানে টরন্টোতে প্রাদেশিক সহায়তায় পরিচালিত শেষ নিরাপদ মাদক গ্রহণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত।

সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রগুলোকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তাদের কার্যক্রম ধীরে ধীরে বন্ধ করার পরিকল্পনা জমা দিতে হবে। পাশাপাশি, যেসব মানুষ নিয়মিত এসব কেন্দ্রে সেবা নেন তাদের কীভাবে চিকিৎসা, পুনর্বাসন বা অন্যান্য সামাজিক সহায়তার আওতায় আনা হবে, সে সম্পর্কেও বিস্তারিত পরিকল্পনা উপস্থাপন করতে বলা হয়েছে।

কমিউনিটি ওয়ার্কার লিন্ডা ফিশার এই প্রতিবেদককে বলেন, এই সিদ্ধান্তের লক্ষ্য হলো মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের দিকে আরও কার্যকরভাবে নিয়ে যাওয়া। একই সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এই নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বলে দাবি করা হয়েছে।

তবে এই যুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও অধিকারকর্মীরা। তাদের মতে, নিরাপদ মাদক গ্রহণ কেন্দ্রগুলো বহু বছর ধরে মাদকাসক্তদের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এসব কেন্দ্র এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে মাদক গ্রহণের সময় অতিরিক্ত মাত্রার ঝুঁকি কমানো যায় এবং তাৎক্ষণিক চিকিৎসা সহায়তা পাওয়া সম্ভব হয়।

মাদক নিরাময় কেন্দ্র সিবিএর পরিচালক টিনা করিম বলেন, এই কেন্দ্রগুলো কেবল মাদক গ্রহণের নিরাপদ স্থান নয় এগুলো চিকিৎসা পরামর্শ, মানসিক সহায়তা এবং পুনর্বাসনের পথ তৈরি করার ক্ষেত্রেও কার্যকর। ফলে এগুলো বন্ধ হয়ে গেলে বহু মানুষ হঠাৎ করেই জরুরি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।

এই সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু টরন্টোতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। অটোয়া, লন্ডন, কিংস্টন, সেন্ট ক্যাথারিনস এবং পিটারবরোসহ আরও কয়েকটি শহরের কেন্দ্রও একই নীতির আওতায় পড়বে বলে জানা গেছে। ফলে পুরো প্রদেশজুড়ে একটি বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক নিশা গোস্বামী জানান, কিছু কেন্দ্র ব্যক্তিগত অর্থায়নে পরিচালিত হওয়ায় আপাতত তাদের কার্যক্রম চালু রাখতে পারবে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সরকারি সহায়তা বন্ধ হয়ে গেলে পুরো ব্যবস্থাটিই দুর্বল হয়ে পড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে তা টেকসই থাকবে না।

এদিকে সরকার বিকল্প হিসেবে নতুন ধরনের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে এবং এই খাতে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু সমালোচকদের দাবি, এসব নতুন কেন্দ্র এখনো বাস্তবে চালু হয়নি এবং কার্যকর হতে যথেষ্ট সময় লাগবে।

কমিউনিটি অ্যাকটিভিস্ট সীমা রহমান বলেন, “বর্তমান কেন্দ্রগুলো বন্ধ হয়ে গেলে এবং নতুন ব্যবস্থা চালু হতে দেরি হলে, মাদকাসক্ত মানুষের জীবন আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাবে।” ক্ষতি কমানোর পক্ষে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, এই নীতিগত পরিবর্তনের ফলে প্রদেশে অতিরিক্ত মাত্রায় মাদক গ্রহণজনিত মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা প্রবল।

সরকারের এই সিদ্ধান্ত এখন এক বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে যেখানে একদিকে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ব্যবস্থার যুক্তি, অন্যদিকে তাৎক্ষণিক জীবনরক্ষাকারী সেবার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট মোকাবিলায় একটি সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণই এখন সময়ের দাবি।

মাসুদ করিম : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

Related Articles

Back to top button