ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসে শিশুদের বাড়তি সময় ব্যয় নিয়ে সতর্ক করে নতুন ভিডিও

মাসুদ করিম

শিশু ও কিশোরদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

শিশু ও কিশোরদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে অল্প বয়সীদের মানসিক স্বাস্থ্য, ঘুমের সমস্যা, মনোযোগের ঘাটতি এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মতো বিষয় সামনে আসায় বিভিন্ন দেশে শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সীমিত বা নিষিদ্ধ করার আলোচনা জোরদার হয়েছে। ঠিক এমন এক সময়ে প্রকাশিত হয়েছে নতুন একটি সচেতনতামূলক ভিডিও প্রজেক্ট ‘দি ৫.২ প্রজেক্ট’, যা আবারও সামনে নিয়ে এসেছে স্ক্রিন টাইমের ভয়াবহ বাস্তবতা।

ভিডিওটিতে অংশ নিয়েছেন জেফ গোথিয়ের এবং তার ১৫ বছর বয়সী ছেলে কাইডেন ওর্থ। নির্মাতারা পুরো একটি দিনজুড়ে কয়েকজন কিশোর কীভাবে সময় কাটায়, বিশেষ করে তারা কতটা সময় ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস ও মোবাইল ফোনে ব্যয় করে, তা ক্যামেরাবন্দি করেন। এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল বাস্তব চিত্র তুলে ধরা এবং পরিবারগুলোকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করা।

কাইডেন ওর্থ এই প্রকল্পে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে বলেন, শুরুতে তার কাছে বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল। তিনি অনুভব করেছিলেন, এটি এমন একটি উদ্যোগ যার সঙ্গে যুক্ত হয়ে সচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখা সম্ভব। তবে বাস্তবে নিজের পুরো দিনের অভ্যাস ক্যামেরায় ধরা পড়তে দেখে তিনি নিজেও বিস্মিত হয়েছেন।

রজার্সের করা আগের এক গবেষণায় উঠে আসে, তরুণরা প্রতিদিন গড়ে ৫ দশমিক ২ ঘণ্টা মোবাইল ফোনে সময় কাটায়। এই তথ্য থেকেই ‘দি ৫.২ প্রজেক্ট’-এর ধারণা আসে। নির্মাতারা প্রতিটি কিশোরের ওপর ৫ দশমিক ২ ঘণ্টা দৈর্ঘ্যের একটি ফুটেজ তৈরি করেন, যেন অভিভাবকেরা নিজেদের সন্তানের বাস্তব স্ক্রিন-নির্ভর জীবন কাছ থেকে দেখতে পারেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি কেবল বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কানাডিয়ান পেডিয়াট্রিক সোসাইটি ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের জন্য দৈনিক সর্বোচ্চ ২ ঘণ্টা স্ক্রিন টাইমের সুপারিশ করেছে। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক কিশোর এই সীমার কয়েক গুণ বেশি সময় ফোনে কাটাচ্ছে।

ভিডিওটি দেখার পর বাবা জেফ গোথিয়েরের প্রতিক্রিয়া ছিল বেশ আবেগপূর্ণ। তিনি বলেন, শুরুতে তিনি এটিকে “আকর্ষণীয়” বলে বর্ণনা করেছিলেন, কিন্তু সেটি আসলে বিদ্রুপ ছিল। কারণ পুরো অভিজ্ঞতাটি তার কাছে মানসিকভাবে অত্যন্ত চাপের এবং অস্বস্তিকর মনে হয়েছে। নিজের সন্তানের দিনের অধিকাংশ সময় একটি ছোট পর্দার ভেতর সীমাবদ্ধ থাকতে দেখা একজন অভিভাবকের জন্য উদ্বেগের বিষয় বলেই তিনি মনে করেন।

প্রযোজকদের তথ্য অনুযায়ী, কাইডেন ওর্থ প্রতিদিন মোট ৮ ঘণ্টা ২১ মিনিট ফোন ব্যবহার করে। তার সময়ের বড় অংশ ব্যয় হয় টিকটক ও স্ন্যাপচ্যাটের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এছাড়া নেটফ্লিক্সে ভিডিও ও সিরিজ দেখতেও সে অনেক সময় ব্যয় করে।

ভিডিওটিতে অংশ নেওয়া আরেক কিশোরী আদ্রিয়ানা জানান, তিনি প্রতিদিন ১৩ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত ফোন ব্যবহার করেন। আরেক অংশগ্রহণকারী সেরেনের দৈনিক স্ক্রিন টাইম ৬ ঘণ্টা ২২ মিনিট। এই পরিসংখ্যানগুলো শুধু অভিভাবকদের নয়, গবেষক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদেরও নতুন করে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে ব্যবহারকারীরা দীর্ঘ সময় ধরে প্ল্যাটফর্মে আটকে থাকে। কিশোর-কিশোরীদের মানসিক গঠন এখনও পরিপূর্ণভাবে বিকশিত না হওয়ায় তারা সহজেই এই আসক্তির শিকার হয়। ফলে বাস্তব সামাজিক সম্পর্ক, খেলাধুলা, পড়াশোনা এবং ঘুমের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে নতুন আইন ও নীতিমালা প্রণয়নের আলোচনা চলছে। কেউ কেউ নির্দিষ্ট বয়সের নিচে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার দাবি তুলছেন। আবার অনেকে বলছেন, সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার বদলে সচেতনতা বৃদ্ধি, পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই হতে পারে কার্যকর সমাধান।

‘দি ৫.২ প্রজেক্ট’ মূলত সেই বাস্তব চিত্রটিই সামনে নিয়ে এসেছে—যেখানে কিশোরদের জীবনের একটি বড় অংশ এখন মোবাইল ফোনের পর্দার ভেতর আটকে যাচ্ছে। আর এই পরিস্থিতি শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং আধুনিক সমাজের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হয়ে উঠছে।

মাসুদ করিম : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

Related Articles

Back to top button