আসন্ন অ্যাকাডেমিক সম্মেলনের সমালোচনায় অন্টারিওর মেটিসরা

মাহবুবুল আলম

শনিবার ও রবিবার অন্টারিওর সল্ট সেন্ট মেরিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই সম্মেলনের শিরোনাম “দি (আন)মেকিং অব মেটিস ক্লেইমস ইন অন্টারিও ফোরাম”।

অন্টারিওতে মেটিস পরিচয় ও আঞ্চলিক অধিকারের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে একটি আসন্ন একাডেমিক সম্মেলন। অন্টারিওর মেটিস নেশনের সদস্যদের অভিযোগ, এই সম্মেলন তাদের ইতিহাস, পরিচয় ও অস্তিত্বের ওপর সরাসরি আঘাত। অন্যদিকে আয়োজক ফার্স্ট নেশন গোষ্ঠীগুলোর দাবি, নিজেদের ঐতিহাসিক ও চুক্তিভিত্তিক অধিকার রক্ষার জন্যই তারা এই সম্মেলনের আয়োজন করছে।

শনিবার ও রবিবার অন্টারিওর সল্ট সেন্ট মেরিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই সম্মেলনের শিরোনাম “দি (আন)মেকিং অব মেটিস ক্লেইমস ইন অন্টারিও ফোরাম”। এর আয়োজন করেছে রবিনসন হুরন ওয়াউইন্ডামাগিউইন, যা ১৮৫০ সালের রবিনসন হুরন চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী ২১টি ফার্স্ট নেশনের সমন্বয়ে গঠিত একটি সংগঠন।

সম্মেলনে অংশ নেওয়া একাধিক একাডেমিক অন্টারিওর মেটিস নেশন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন। তারা বিশেষভাবে প্রশ্ন তুলেছেন অন্টারিওতে ঘোষিত মেটিস নেশনের ছয়টি নতুন কমিউনিটির বৈধতা নিয়ে। উল্লেখযোগ্য যে, এই ছয়টি কমিউনিটিকে ২০১৭ সালে অন্টারিও প্রদেশ সরকার স্বীকৃতি দিয়েছিল।

ফার্স্ট নেশনগুলোর দাবি, এই স্বীকৃতি তাদের ঐতিহাসিক ভূমি, অধিকার এবং চুক্তিভিত্তিক দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাদের মতে, যেসব এলাকাকে মেটিস নেশন তাদের ঐতিহ্যগত অঞ্চল হিসেবে দাবি করছে, সেখানে ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত মেটিস কমিউনিটির কোনো শক্ত নথিভুক্ত বা মৌখিক প্রমাণ নেই।

রবিনসন হুরন ওয়াউইন্ডামাগিউইনের জ্যেষ্ঠ নীতি বিশ্লেষক স্যাম ম্যানিটোয়াবি বলেন, “এই সম্মেলনের উদ্দেশ্য হলো ফার্স্ট নেশনগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি শোনা নিশ্চিত করা। আমাদের কমিউনিটির প্রবীণদের মৌখিক ইতিহাস রয়েছে, তারা নিজেরাই ইতিহাসবিদ। যদি আমাদের অঞ্চলে সত্যিই কোনো মেটিস কমিউনিটি থেকে থাকে, তাহলে তাদের গল্প, তাদের স্মৃতি এবং নথিভুক্ত ইতিহাস থাকার কথা। কিন্তু আমরা সেগুলো পাইনি।”

ফার্স্ট নেশনগুলোর অভিযোগ, অন্টারিওর মেটিস নেশন যেসব কমিউনিটির প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করছে, সেগুলোর অস্তিত্ব ঐতিহাসিক নয় বরং আধুনিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

অন্যদিকে, অন্টারিওর মেটিস নেশন এই সম্মেলনকে তাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত আক্রমণ হিসেবে দেখছে। সংগঠনটির সদস্যদের মতে, একাডেমিক গবেষণার নামে তাদের পরিচয় ও অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে।

স্টিভ পাউলি যিনি শিকারের অধিকার সংক্রান্ত মামলায় সুপ্রিম কোর্টে জয়ী হয়েছিলেন তার কন্যা কিম পাউলি বলেন, “আমার শহরে এই ধরনের সম্মেলনের আয়োজন আমার পরিবারের জন্য ব্যক্তিগতভাবে খুবই কষ্টদায়ক। এটি শুধু আমার বাবার উত্তরাধিকার নয়, পুরো মেটিস কমিউনিটি ও আমাদের নাগরিকদের ওপর আক্রমণ।”

মেটিস নেশন ধারাবাহিকভাবে ফার্স্ট নেশন সংশ্লিষ্ট একাডেমিকদের গবেষণা প্রত্যাখ্যান করে আসছে। তাদের বক্তব্য, এসব গবেষণা পক্ষপাতদুষ্ট এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত। সংশ্লিষ্ট একাডেমিকরাও পাল্টা যুক্তিতে বলেছেন, তারা রাজনৈতিক নয়, বরং ঐতিহাসিক প্রমাণ ও নথির ভিত্তিতেই প্রশ্ন তুলছেন।

এই সম্মেলন ২০২৩ সালে শুরু হওয়া বৃহত্তর বিতর্কেরই সর্বশেষ অধ্যায়। ওই বছর ফেডারেল সরকার অন্টারিওর মেটিস নেশনকে স্বশাসনের অধিকার দেওয়ার লক্ষ্যে একটি আইন পাসের উদ্যোগ নেয়। তবে ফার্স্ট নেশনগুলো এবং কানাডার অন্যান্য প্রদেশের মেটিস গোষ্ঠীগুলোর তীব্র বিরোধিতার মুখে শেষ পর্যন্ত সেই বিলটি পাস হয়নি। বিরোধী গ্রুপগুলো বিলটির প্রতি তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়।

ফার্স্ট নেশন ও মেটিস নেশনের মধ্যকার এই বিরোধ কেবল ইতিহাস ব্যাখ্যার প্রশ্ন নয়; এটি ভূমি, স্বীকৃতি, অধিকার ও রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। সল্ট সেন্ট মেরিতে অনুষ্ঠিতব্য এই সম্মেলন সেই উত্তেজনাকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিতর্কের সমাধান সহজ নয় এবং ভবিষ্যতেও কানাডার আদিবাসী রাজনীতিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

Related Articles

Back to top button